যুক্তরাষ্ট্র-ইইউ বাণিজ্য চুক্তি

ইউরোপে হতাশার সুর: ‘আত্মসমর্পণের’ অভিযোগ ফ্রান্সের, সতর্ক জার্মানি

জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ সতর্ক করে বলেন, এই চুক্তি জার্মানির আর্থিক অবস্থাকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। অন্যদিকে, ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া বাইরু মন্তব্য করেন, এই চুক্তি আত্মসমর্পণের শামিল।

চুক্তির ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশিরভাগ রফতানি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে ১৫% শুল্ক আরোপ হবে—যা ট্রাম্পের আগের হুমকিতে বলা ৩০% শুল্কের অর্ধেক। এর বিনিময়ে ইউরোপ আরো বেশি আমেরিকান জ্বালানি কিনবে এবং কিছু মার্কিন আমদানির ওপর কর ছাড় দেবে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান উরসুলা ভন ডার লেয়েন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে সদ্য সম্পাদিত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে হতাশার সুর। ইউরোপের দুই প্রধান অর্থনীতি জার্মানি ও ফ্রান্সের নেতৃত্বে এই চুক্তিকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিকর বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। খবর বিবিসি।

জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ সতর্ক করে বলেন, এই চুক্তি জার্মানির আর্থিক অবস্থাকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। অন্যদিকে, ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া বাইরু মন্তব্য করেন, এই চুক্তি আত্মসমর্পণের শামিল।

চুক্তির ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশিরভাগ রফতানি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে ১৫% শুল্ক আরোপ হবে—যা ট্রাম্পের আগের হুমকিতে বলা ৩০% শুল্কের অর্ধেক। এর বিনিময়ে ইউরোপ আরো বেশি আমেরিকান জ্বালানি কিনবে এবং কিছু মার্কিন আমদানির ওপর কর ছাড় দেবে।

চুক্তিটি স্কটল্যান্ডে ট্রাম্পের টার্নবেরি গলফ কোর্সে অনুষ্ঠিত ব্যক্তিগত বৈঠকে সম্পন্ন হয়। পরে ভন ডার লেয়েন একে ‘একটি বিশাল অর্জন’ বলে আখ্যায়িত করেন আর ট্রাম্প বলেন, এটি ইউএস ও ইইউকে আরো কাছাকাছি নিয়ে আসবে।

তবে এই চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য রাষ্ট্রের অনুমোদন প্রয়োজন। যদিও কোনো দেশ এটিকে পুরোপুরি অবরুদ্ধ করার কথা বলেনি, তবুও উৎসবের কোনো আভাস ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে দেখা যায়নি।

জার্মান চ্যান্সেলর মার্জ মন্তব্য করেন, ‘এই পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আলোচকরা এর চেয়ে বেশি কিছু অর্জন করতে পারতেন না, কারণ ট্রাম্প তার বাণিজ্য নীতি পুনর্বিন্যাস করার ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে ছিলেন।‘

ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী বাইরু এক্সে লেখেন, ‘আজ একটি অন্ধকার দিন—যখন স্বাধীন মানুষের একটি জোট, যারা একযোগে তাদের মূল্যবোধ ও স্বার্থ রক্ষা করতে একত্র হয়েছিল, তারা আত্মসমর্পণ করে বসে।‘

হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র ভিক্টর অরবান বলেন, ট্রাম্প সকালে ভন ডার লেয়েনকে ‘নাশতার’ মতো করেই শেষ করেছেন।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, ‘আমি চুক্তিকে সমর্থন করব, তবে কোনো উৎসাহ ছাড়াই।‘

তবে কিছু ইউরোপীয় নেতা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন যে, অন্তত একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য যুদ্ধ এড়ানো গেছে। ফিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী একে ‘প্রয়োজনীয় পূর্বের অবস্থা’ ফিরিয়ে আনার একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছেন। আইরিশ বাণিজ্য মন্ত্রী সাইমন হ্যারিস বলেন, এটি চাকরি, প্রবৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের জন্য অত্যাবশ্যকীয় নিশ্চয়তা এনে দিয়েছে।

ইইউর বাণিজ্য কমিশনার মারোস সেফকোভিচ সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে আমরা যে সেরা চুক্তি পেতে পারতাম এই চুক্তি সেটাই।‘ তিনি আরো উল্লেখ করেন, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

রোববার চুক্তিকে ‘সাফল্য’ হিসেবে উপস্থাপন করলেও সোমবার ভন ডার লেয়েনের নিজের দল ইউরোপীয় পিপলস পার্টির নেতা মানফ্রেড ওয়েবার বলেন, ‘এটি ছিল আসলে ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের চুক্তি।‘

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক প্রতিক্রিয়াও ছিল মিশ্র। ওয়াশিংটন ভিত্তিক ন্যাশনাল ফরেন ট্রেড কাউন্সিল একে ‘বাণিজ্য যুদ্ধ এড়ানোর জন্য একটি ইতিবাচক অগ্রগতি’ বললেও সতর্ক করে দেয় যে, স্বল্পমেয়াদি লাভের বিনিময়ে দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রধান মিত্রদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে এবং বিশ্বাস হারাতে পারে।

তারা উল্লেখ করেন, শুল্কমুক্ত পুরোনো ব্যবস্থা উভয় মহাদেশে বিমান ও ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পকে বিকাশে সহায়তা করেছে। নতুন চুক্তির কাঠামো ইইউর কিছু বিভ্রান্তিকর নীতিকে অক্ষত রেখেছে— যার মধ্যে রয়েছে তথাকথিত বৈষম্যমূলক ডিজিটাল নীতি ও অন্যায্য ওষুধ মূল্য ফেরত নীতি।

চুক্তি কার্যকর হলে তা ইউরোপের অর্থনীতির ওপর আঘাত হানবে ঠিকই, তবে তা ট্রাম্পের প্রাথমিক হুমকির তুলনায় অনেকটা কম বলেই মত বিশ্লেষকদের। তবুও, এই চুক্তিকে ইউরোপ জয় নয়, বরং একটি ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

আরও